এই সিরিজের আগের দুইটি পোস্টে আমি জানিয়েছিলাম, কেন ছাত্র-ছাত্রীরা ম্যাথস ভয় পায়। প্রথম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলাম ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যারিয়ার, তথা ইংরেজীতে অদক্ষতা বা ম্যাথ পড়ে কি চাচ্ছে সেটা না বুঝতে পারার সমস্যাকে। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলেছিলাম কনসেপ্ট পুরোপুরি ক্লিয়ার না করেই সরাসরি অনুশীলনে চলে যাওয়া এবং স্কুল-কলেজ জীবনে সিলেবাসের একটা বড় অংশ বাদ দিয়ে যাওয়ার কথা।

আজ নিয়ে আসলাম এ সিরিজের তৃতীয় এবং শেষ পোস্ট নিয়ে।

তৃতীয় কারণঃ ক্যালকুলেশনে অদক্ষতা

এটিকে আমি ঠিক বিভীষিকা বলতে রাজী নই। এটা এমন কোন কারণ না যার কারণে ছাত্র-ছাত্রীরা ম্যাথসকে ভয় পায়। বরং এটিকে আমি বিভিন্ন পরীক্ষায় ম্যাথস অংশে ভালো না করতে পারার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাই। এটি ম্যাথসকে আপনার কাছে কখনও ফোবিয়া বানিয়ে দেবেনা, কিন্তু এই জায়গাটাতে দক্ষতা না থাকলে আপনি নিজের অজান্তেই পরীক্ষার ম্যাথস অংশে খারাপ করবেন নিশ্চিতভাবে। কেউ ঠেকাতে পারবেনা।

একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুনতো বিষয়টা- যেকোন অ্যাপটিটিউড টেস্টে আপনাকে যে জিনিসটার সাথে মূলত যুদ্ধ করতে হবে তা হলো সময়। সময়ই দু’জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পার্থক্য করে দেয়। অংকপ্রতি ৫ মিনিট করে সময় দেওয়া হলে পরীক্ষার হলের ৬০% পরীক্ষার্থী প্রায় সব অংকের সঠিক উত্তর বের করে ফেলতে পারবে। কিন্তু আসলে কি অতোটা সময় পাবেন? তাহলে? পরীক্ষার হলে আপনি একটা অংক করার জন্য গড়ে সময় পাবেন কতটুকু?

বাস্তবতায় ফিরে আসুন এবার। আমি ধরে নিচ্ছি, বড়জোর এক মিনিট কুড়ি সেকেন্ড করে সময় পাবেন আপনি একটা অংক করতে। এবার ধরুন, একটা অংকের শেষে গিয়ে আপনাকে ২৬x২৮ এই ক্যালকুলেশনটি করতে হবে। এই ক্যালকুলেশনটি করার জন্য কতটুকু সময় নেওয়া উচিৎ হবে আপনার। কেমন হবে যদি ১৫ সেকেন্ড ধরে এটাই ভেবে বের না করতে পারেন যে ২৬ এর নীচে ২৮ কে বসিয়ে গুণ করবেন, নাকি ২৮ এর নীচে ২৬ কে বসিয়ে গুণ করবেন? তারপর সেই গুণ করতে লাগবে আরও ২০ সেকেন্ড! চিন্তা করেছেন একবার, অংকটি করতে সময় বরাদ্ধ ছিলো ১ মিনিট ২০ সেকেন্ড (৮০ সেকেন্ড); এর মধ্যে ৫০% সময় তো খেয়ে দিলেন এক সামান্য গুণ করতে গিয়ে! তাহলে অংকটি সমাধানেরর মূল কাজগুলো কখন করবেন? ফলাফল কি জানেন? ১ মিনিট ২০ সেকেন্ডের জায়গায় আপনার অংকপ্রতি সময় লেগে যাচ্ছে ২ মিনিট করে। তারমানে আপনি প্ল্যান করেছিলেন ৩৪ মিনিটে ২৫ টি অংক করবেন; কিন্তু পারলেন ১৭ টি করতে। ছোট্ট একটি অদক্ষতার কারণে ৮ টি অংক, মানে ৮ মার্ক কম পাচ্ছেন আপনি একটা পরীক্ষায়!

সমাধান কি?

এ সমস্যার রাতারাতি কোন সমাধান নেই। চাইলেই আপনি আলাদীনের চেরাগ পেয়ে রাতারাতি ফাস্ট ক্যালকুলেশন শিখতে পারবেন না। দুনিয়ার সেরা ইউনিভার্সিটির সেরা একজন ম্যাথস ফ্যাকাল্টির কাছে গিয়ে পড়লেও লাভ হবেনা কোন। একমাত্র আপনি নিজেই পারেন নিজেকে হেল্প করতে। মনের বিকলাঙ্গতা দূর করতে হবে। একজন বিকলাঙ্গ মানুষ যেমন ক্র‍্যাচ ছাড়া চলতে পারেনা, আপনিও যদি তেমনি ক্যালকুলেটর ছাড়া ক্যালকুলেশন না করতে পারেন, তাহলে আপনি যে মানসিকভাবে কিছুটা বিকলাঙ্গ তা না বলে পারছিনা আমি৷ আমাকে যতই গালি দেন মনে মনে…হা হা হা। এ সমস্যা থেকে উত্তোরণের জন্য আপনাকে তপস্যা করতে হবে। ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে হাতের ক্যালকুলেটর। আমার ম্যাথস ক্লাসে যদি কোন স্টুডেন্টকে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে দেখি, তার জন্য কঠিন একটা ঝাড়ি বরাদ্ধ হয়ে যায় 

এনিওয়ে, যে ছেলেটা/মেয়েটা ক্যালকুলেশনে বেশ ভালো সে উপরের ক্যালকুলেশন কিভাবে করবে জানেন? ২৬x২৮=২৬(৩০-২)=৭৮০-৫২=৭২৮
ক্যালকুলেশনের এ মেথডটি ক্লাস ফোর-ফাইভে শিখে এসেছেন। এখন ভুলে গেছেন। এ মেথডের নাম Putting Brackets and Removing Brackets!

ফাস্ট ক্যালকুলেশনের জন্য সবচেয়ে ইফেক্টিভ উপায় বড় ক্যালকুলেশনগুলোকে ছোট ছোট ভাবে ভেঙ্গে তারপর ক্যালকুলেট করা। আমার বুড়ি মা কে দেখতাম তেষট্টি টাকাকে বলতে তিন কুড়ি তিন টাকা!

হ্যাঁ ভাইজান…এটাই মূলমন্ত্র। তিন কুড়ি তিন টাকা!

বিঃদ্রঃ ক্যালকুলেশন নিয়ে আরও দুইটি পোস্ট দেওয়ার ইচ্ছা আছে। কানেক্টেড থাকেন সবাই। যারা এ সিরিজের আগের দুইটি পোস্ট পড়েননি তারা আমার প্রোফাইলে একটা ঢুঁ দিয়ে আসতে পারেন চাইলে।

ফেরদৌস কবির

ডেপুটি ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ব্যাংক

এমবিএ (আইবিএ, ঢাবি)