আগের পোস্টে বলেছিলাম ম্যাথসে ভালো করতে না পারার প্রথম কারণ বা ভয় হচ্ছে ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যারিয়ার। ইংরেজীতে ম্যাথস করতে হবে এই জিনিসটাই অনেকে মেনে নিতে পারেনা। কারণ, আমরা বাংলা মিডিয়ামের স্টুডেন্টরা সেসময় কখনও চিন্তাও করতে পারিনি যে ম্যাথস কখনও আবার ইংরেজিতে করতে হতে পারে! পরবর্তীতে এসেও মেনে নিতে পারিনি এই কঠিন সত্যটি।

যাহোক, এই পোস্টে বলবো ম্যাথসে খারাপ করার ২য় কারণ সম্বন্ধে।

আমি এটিকে দুই নম্বরে রাখলেও এটিই আসলে প্রধান কারণ!

২য় কারণঃ কনসেপচুয়াল সমস্যা

আচ্ছা বলুন তো…যাবতীয় অ্যাপটিউড টেস্টে (আইবিএ, ব্যাংক জব, বিসিএস কিংবা ইন্টারন্যাশনাল দিকে জিম্যাট-জিআরই-স্যাট সব) ম্যাথস আসে কোন লেভেল থেকে? সবাই জানেন উত্তরটা। স্কুল লেভেল থেকে। আরও সোজা ভাষায় বললে স্কুল লেভেলের জেনারেল ম্যাথস। ক্যালকুলাস টাইপ অ্যাডভান্সড কোন ম্যাথস কিন্তু আসবেনা এসব পরীক্ষায়। ত্রিকোনমিতি থেকে যেটা থাকে সেটা খুবই বেসিক লেভেলের, যা আমরা সায়েন্স, আর্টস, কমার্স সবদিকের ছাত্র-ছাত্রীরাই করে এসেছি স্কুলে। তবে স্কুল লেভেল বলতে কিন্তু বাইরের দেশের হাইস্কুল পর্যন্ত বুঝায়, যাকে আমাদের দেশে কলেজ বলা হয়। সুতরাং আমাদের এখানের কলেজ লেভেলের ম্যাথসের অল্প কিছু সিলেবাস (কো-অর্ডনেট জিওমেট্রি টাইপ) কাভার করা হয় এসব টেস্টগুলোতে। তবে যেহেতু আমাদের এখানে শুধু সায়েন্সের স্টুডেন্টরাই কলেজে ম্যাথস নিতে পারে, সেই সিলেবাসটুকু আর কমার্স বা আর্টসের স্টুডেন্টদের জন্য কাভার করা হয়না সেসময়। আবার দুইবছর এক্সট্রা অনুশীলনের কারণে সায়েন্সের স্টুডেন্টরা কিছুটা এগিয়ে যায় অন্যদের থেকে একারণে। এই অংশ থেকে অবশ্য খুব বেশী যে কাভার করে তাও না। এজন্য কমার্স বা আর্টসের স্টুডেন্টদের হতাশ হওয়ার দরকার নেই।

আমার প্রশ্ন খুবই সিম্পল। এই যে জীবনভর অংক করে আসছেন, সেই একই সিলেবাসের অংক কেন পারছেন না গ্রাজুয়েশন শেষ করার পরে, সেটা কি কখনও ভেবে দেখেছেন একবার?

আমি বলি কারণগুলো

১। স্কুলজীবনের অংক বইয়ের প্রতিটি চ্যাপ্টারের শুরুতে ডিসকাশন থাকতো কিছু। অনুশীলনীর অংক শুরু করার আগে কয়জন পড়েছেন সেই ডিসকাশন অংশটা? বুকে হাত দিয়ে কয়জন বলতে পারবেন যে ওই অংশটা খুব ভালোমতো পড়ে তারপর অনুশীলনীর অংক শুরু করেছেন?

একট দোষ আমি আমাদের স্কুলজীবনের শিক্ষকদেরকেও দিতে চায়। তারা ক্লাসে ঢুকে বলতেন, ”এই অমুক চ্যাপ্টারের অমুক নম্বর অংকটা শুরু কর।” তিনি হয়তো দুই-তিনটা অংক করিয়ে দিতেন। তারপরের ডায়ালগ, ”বাকী অংকগুলো অমুক গাইড থেকে দেখে নিস!”

কি? মিলে যাচ্ছে কথাগুলো?

২। উপপাদ্য-৩৩ আগের বছরে চলে এসেছে, এবার না পড়লেও চলবে! হা হা হা! মনে পড়ে এসব?

ফলাফল? পুরো ম্যাথস সিলেবাসের ৫০% স্কিপ করে এসেছেন। এ+ পাওয়াটাই ছিলো আপনাদের একমাত্র লক্ষ্য! শেখেননি কিছুই! ইতিহাস ক্ষমা করেনা রে ভাই! এখন যখন ব্যাংক জবের এক্সাম দিতে যাচ্ছেন, আইবিএ তে এমবিএ ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছেন, বিসিএস দিতে যাচ্ছেন, জিম্যাট দিতে যাচ্ছেন…সিন্দাবাদের ভূতের মতো ঘাড়ে চেপে বসছে সেই পুরাতন সিলেবাস। যে গার্লফ্রেন্ডকে তখন পাত্তা দেননি তখন, সেই এখন বিশ্বসুন্দরী! কিছু করার নাই এখন। উপপদ্য-৩৩ এর পিছন পিছন ঘুরবেন এখন!

যাহোক, এর অনেক কিছুর উপরে আমাদের নিয়ন্ত্রণ ছিলো সেসময়ে, আবার অনেক কিছুই আমাদের হাতে ছিলো না। আমরা ছিলাম পরিস্থিতির শিকার মাত্র! কিন্তু ভিকটিম কিন্তু আমরাই। ম্যাথসের কনসেপ্ট বিল্ডিং টাই হয়নি ভালোমতো। তখন যদি বুঝতাম বুড়ো হয়েও ঘুরেফিরে সেই স্কুল লেভেলের ম্যাথসই করতে হবে, তাহলে কি আর ফাঁকি দিতাম তখন!

এটার সমাধান কি?

ভয়ের কিছু নেই। এটার অন্তত সমাধান আছে। ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যারিয়ারের ক্ষেত্রে বলেছিলাম দুনিয়ার কোন শিক্ষকই আপনার উপকার করতে পারবেনা, আপনি নিজে ছাড়া। কিন্তু এক্ষেত্রে চাইলেই এক্সপার্টদের হেল্প নিতে পারেন। আবার চাইলে সময় নিজে নিজে নিজেই সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এটার জন্য অভ্যাস চেঞ্জ করার মতো কোন কঠিন প্রসেসে যেতে হবেনা। তবে চাই সংকল্প, একাগ্রতা আর কঠিন পরিশ্রম। সমস্যার সমাধান একটাই। স্কুল লাইফের পড়াশোনায় ফাঁকি মেরে এসেছেন, সেই ফাঁকিগুলোর প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। সরাসরি স্কুল লেভেলের বই থেকে আবার প্র্যাক্টিস করতে পারলেও চলে, আবার কনসেপ্ট ক্লিয়ার করে জিম্যাট-জিআরই-স্যাটের অংক শিখলেও চলে। যে যেভাবে কমফোর্ট ফিল করেন। আমি পারসোনালি Kaplan GRE/GMAT Math Workbook বইটা সাজেস্ট করি।

তবে হাতে সময় বেশী থাকলে আমি বরং স্কুল লেভেলের ম্যাথস আবার করতেই উৎসাহ দিই। তবে বাংলা বই না অবশ্যই। আমাদের নিজেদের সিলেবাস করতে চাইলে ইংলিশ ভার্সনের বইগুলো শেষ করতে পারেন। জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ওয়েবসাইটে এক্কেবারে ঝকমকা পিডিএফ ফাইল পেয়ে যাবেন।

আর কেউ যদি খুব ভালোভাবে ম্যাথসের ভুত তাড়াতে চান, সেক্ষেত্রে আমি বৃটিশ কারিকুলামের (ক্যাম্ব্রিজ সিলেবাস) গ্রেড সিক্স থেকে এইটের জেনারেল ম্যাথস বইগুলো শেষ করে ফেলতে বলবো। এগুলোর কোন সল্যুশন বই পাবেন না। কোন ম্যাথসে আটকে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা মাথা খাটিয়ে সলভ করবেন দরকার হলে।

আজ এ পর্যন্তই। দুএকদিন পরে ৩য় কারণ নিয়ে পোস্ট দেবো ইন শা আল্লাহ্‌।

ফেরদৌস কবির

ডেপুটি ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ব্যাংক

এমবিএ, আইবিএ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)