পরীক্ষাগুলোর রিটেন পার্ট…অনেকের কাছেই খুব বিভীষিকাময় একটি ব্যাপার। অনেকেই নৈর্ব্যক্তিক পার্টে খুব ভালো করলেও বার বার হোঁচট খাচ্ছেন এই রিটেন পার্টে এসেই। বিভিন্ন প্লাটফর্মে সমাধান চেয়ে পোস্ট দিচ্ছেন আপনারা; নানারকম সমাধান পাচ্ছেন। আজকে আমি চেষ্টা করি আপনাদের এ সমস্যার কিছুটা সমাধান দিতেঃ

শুরুতেই একটা রিয়েল লাইফ এক্সাম্পল দিই। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখাগুলো উপভোগ করেন না এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। উনি মারা যাওয়ার পর বাংলা সাহিত্যের একটা অংশে বেশ শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে এবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে হুমায়ূনপ্রেমীদের কিন্তু তাতে খুব একটা সমস্যা হয় না। কারণ ফেইসবুকে কয়েকজন তরুণ লেখক আছেন যারা একদম হুমায়ুন আহমেদের আদলে লিখতে পারেন। এদের কেউ মিসির আলী/হিমু সিরিজের নতুন কোন গল্প পোস্ট দিলে আপনি ধরতেই পারবেন না যে গল্পটি হুমায়ুন আহমেদের লেখা নাকি অন্য আরেকজনের। সেইম স্টাইল, সেইম লেখনী…এবং পড়ার সময় সেইম ফিলিং যেটা আপনি হুমায়ুন আহমেদের লেখা পড়েও পেতেন। এই লেখকদের একেকজনের এক-দেড়লাখ করে ফলোয়ার। একটা নতুন লেখা দেওয়া মাত্রই মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মূহুর্তেই ১৫-২০ হাজার লাইক!

যাহোক…আসল কথায় আসি। কখনও কি চিন্তা করে দেখেছেন এরা হুমায়ুন আহমেদের লেখার স্টাইল, একই ধরণের শব্দচয়ন এতকিছু কিভাবে হুবহু কপি করতে পারে? চিন্তা করেছেন কখনও এভাবে? কারণ একটাই, এরা হুমায়ূন আহমেদের প্রতিটি বই এতবার করে পড়েছে যে কোন বইয়ের কোথায় দাড়ি, কোথায় সেমিকোলন, কোথায় কমা…আলমোস্ট সেটাও বলতে পারবে।

এখন আপনিই বলুন, আপনি যে দ্যা ইকোনমিস্টের আর্টিকেলগুলোর স্টাইলে লিখতে চান, আপনি জীবনে কয়টা ইকোনমিস্টের আর্টিকেল পড়েছেন? আপনি নিউইয়র্ক টাইমস এর স্ট্যান্ডার্ডে লিখতে চান…কয়দিন পড়েছেন আপনি নিউইয়র্ক টাইমস? আপনি আগামী একবছর ধরে দ্যা ইকোনমিস্টের মেইন আর্টিকেলগুলো পড়েন…প্রতি দুইদিনে একটা করে। এর মধ্যে যেসব অপরিচিত ভোকাব্যুলারি পাবেন সব মুখস্ত করে ফেলবেন; একবছর পরে আপনি ইকোনমিস্টের রাইটিং স্ট্যান্ডার্ডের ৫০% এর কাছাকাছিও যদি যেতে পারেন…বাংলাদেশের কোন এক্সাম আপনাকে আটকাতে পারবেনা। লিখিত নিয়েন আমার কাছ থেকে।

এবার আপনাদের লাইফ থেকেই আরেকটা এক্সাম্পল দিই। ক্লাসে এরকম কিছু ফ্রেন্ড ছিলো না আপনাদের, যারা আসলে খুব একটা ভালো (পড়ুন পড়ুয়া) ছাত্রের তালিকাতেও পড়েনা, আবার এক্সাম হলে দেখাদেখি করে লিখতেও ভয়/লজ্জা পায়? এদের একটা বৈশিষ্ট্য দেখেছেন কখনও খেয়াল করে যে এরা আসলে এক লাইন তথ্য জানলে সেটাকে ৪ লাইন বানিয়ে লিখে আসতে পারে? আলটিমেটলি এরা ক্লাসের টপার কখনও হয়না ঠিকই, কিন্তু একদম ফেলু স্টুডেন্টদের তালিকায়ও থাকেনা কখনও। এদের বেশিরভাগেরই দেখবেন একাডেমিক পড়ার দিকে ঝোঁক না থাকলেও বাইরের বিভিন্ন বিষয়/গল্পের বই ইত্যাদি পড়ার দিকে বেশ ঝোঁক থাকে। আরও খেয়াল করে দেখবেন, এরা চাকুরীর পরীক্ষাগুলোর জন্য আপনাদের চেয়ে অনেক কম শ্রম দেওয়ার পরেও আপনাদের আগেই ভালো ভালো চাকুরীতে ঢুকে যাচ্ছে। কারণ কি জানেন? এরা আপনাদের মতো রিটেন পার্টের জন্য বিভিন্ন টপিক মুখস্থ করেনা। একটা টপিকে সামান্য জানলেও সে টপিকের উপরে একটা স্ট্যান্ডার্ড সাইজের রাইট আপ কিভাবে দাড় করানো যায় সে প্র‍্যাকটিসটা এদের স্কুল লাইফ থেকেই আছে। আর আপনারা বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট দিয়ে খুঁজে বেড়াবেন, “রিটেনের জন্য সাম্প্রতিককালের গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো কি কেউ বলতে পারেন?”!

তবে একটা জিনিস জেনে রাখেন, ইংরেজী লেখা বলেন আর পড়া বলেন…দুইটা জায়গাতেই এক্সপার্ট হতে চাইলে গ্রামারের যে টপিকটা খুব ভালো করে শিখতেই হবে সেটা হচ্ছে ” Clause”।

মাথায় রাখবেন, “যেমন কর্ম, তেমন ফল”। ডেইলি স্টার দিয়ে রিডিং আর রাইটিং এ ভালো করতে চাইলে তার রেজাল্টও হবে ডেইলি স্টারের লেখার মতোই (প্রায় ক্ষেত্রেই প্রচুর ভুল)। আর The Economist, The New York Times, Wall Street Journal, Scientific American, The New Yorker, National Geographic, The Atlantic, Harvard Business Review, The Washington Post টাইপ ম্যাগাজিনের সাহায্য নিলে রেজাল্ট হবে সেগুলোর মতোই।

পরিশেষে একটা কথা বলতেই হয়…রিটেন পার্টটা কিন্তু এমসিকিউ এর মতো না যে কয়েকদিন একটু কষ্ট করে ম্যাথসের কয়েকটা শর্টকাট, ইংলিশ গ্রামারের কিছু নিয়ম, কিছু সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করে আর ফকিরের কেরামতিতে আন্দাজে দাগানো কিছু উত্তর মিলিয়ে টিকে যাবেন। রিটেন পার্টে ভালো করতে হলে কিন্তু সাধনা চাই; ভিতর থেকে শিখতে হবে। ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি এইচডি গ্লোর মতো, ভিতর থেকে ফর্সা করতে হবে 

জনপ্রিয় লেখক স্টিফেন কিং বলেছিলেন, “If you want to be a writer, you must do two things above all others: read a lot and write a lot.”

ফেরদৌস কবির

ডেপুটি ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ব্যাংক

এমবিএ, আইবিএ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)