প্রাইভেট ব্যাংকের সিলেকশন প্রোসেসঃ

বেশীরভাগ প্রাইভেট ব্যাংকই আবেদন গ্রহণ করার পরে শর্টলিস্টিং করে যে কারা এক্সামে অংশগ্রহণ করতে পারবে৷ এই শর্টলিস্টিং করার কোন স্পেসিফিক নিয়ম নেই। একেকটা ব্যাংক তাদের নিজস্ব পলিসি অনুযায়ী এটা করে। এ শর্টলিস্টিং করার সময় অনেক ক্রাইটেরিয়া সামনে নিয়ে আসে তারা। ২-৩ টা ব্যাংকের এইচআরডি তে কথা বলে যতটুকু বুঝলাম, এটা কাইন্ড অব সাইকোলজিক্যাল অ্যাজাম্পশনের কমবিনেশন। যেমনঃ

হাই সিজিপিএ মানে আপনি পরিশ্রমী, ডিসিপ্লিনড লাইফ লিড করেন, আপনার টার্গেট থেকে বিচ্যুত হননা কখনও। আর যেহেতু সিজিপিএ হাই…তারমানে অন্তত সামান্য কিছু হলেও শিখেছেন ইউনিভার্সিটি থেকে।

এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ একটা বড় রোল প্লে করে এখানে। তবে সিভি ভরে রাখা জগা-মগা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ না। কিছু অ্যাকটিভিটিজ দেখলেই বোঝা যায়, এগুলো আপনি জীবনেও করেননি কিন্তু সিভি তে দিয়ে রেখেছেন। মনে রাখবেন…আপনি যে স্কুলের ছাত্র ব্যাংকের এইচআর এর লোকজন ওই স্কুলের মাস্টার। ডোন্ট বি ওভারস্মার্ট। ডিবেট টাইপের অ্যাকটিভিটিজ কে সব জায়গাতেই প্রেফারেন্স দেওয়া হয়। কারণ, যারা ডিবেটিং এর সাথে জড়িত তাদের একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে প্রচুর নলেজ থাকে, সাথে থাকে খুব ভালো অ্যানালাইসিস করা এবং লুপহোল ধরার ক্ষমতা। অন্যান্য অ্যাকটিভিটিজগুলোকে ইভ্যালুয়েট করা হয় সেখানে আপনার অর্গানাইজিং ক্যাপাবিলিটি/অ্যাকটিভিটিজ এর উপরে ভিত্তি করে।

কমিউনিকেশন স্কিল এবং স্মার্টনেস খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক্ষেত্রে। আপনি ব্যাংকের একজন রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেব কাস্টমারদের সাথে কিভাবে ডিল করবেন সেটা যাচাই করাটাই ব্যাংকের প্রথম কাজ। এখানেই ঝরে পড়ে সবচেয়ে বেশী মানুষ। তারা এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভার দেখেই ডিসিশন নেয়। টপ কয়েকটা পাবলিক ইউনিভার্সিটির হাতে গোণা কিছু ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট এবং টপ ২-৪ টা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টদের তারা প্রাধান্য দেয়। আপনাদের পূর্বপুরুষদের গুণ অথবা আকাম-কুকামের একটা ইফেক্ট থাকে এখানে। কোন ইউনিভার্সিটির পোলাপাইন ভালো পারফর্ম করেছে, কারা খারাপ করেছে তার ডাটাবেইজ থাকে ভালো ব্যাংকগুলোর এইচআর এ। যেরকম বেশীরভাগ প্রাইভেট ব্যাংক আইবিএ গ্রাজুয়েট শুনলে আগেই নেগেটিভ চিন্তা করে যে একে নিলে সে আমার এখানে কয়দিন থাকবে। আইবিএ’র একটা ব্যাচ থেকে প্রাইম ব্যাংকে এমটিও হিসেবে একসাথে ২৩ জনকে রিক্রুট করা হয়েছিলো। মাত্র ৬ মাসের মাথায় ৫ জন বাদে সবি চাকুরী ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। প্রাইম ব্যাংক কোন ভরসায় আইবিএ গ্রাজুয়েট নেবে বলেন তো!

দিনশেষে প্রাইভেট ব্যাংকগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। টিকে থাকতে হলে তাদের লাভ করতে হবে। আপনার সিভি দেখে যদি বোঝা যায় আপনার আত্মীয়স্বজন উচ্চবিত্ত শ্রেণীর তাহলে আর আপনার চিন্তা করার দরকার নেই। তাদেরকে খুব ভালো পরিমাণ ব্যবসা যে আপনি দিতে পারবেন সেটা তারা জানে।

 

বছর ৭-৮ আগের একটা ঘটনা শুনলামঃ চট্টগ্রামের খুব উচ্চশ্রেণির একটা পার্টি, যাদের ১৮ টা কনসার্ন কোম্পানি ছিলো সেসময়ে। ভদ্রলোক বেশ নামকরা একটা ব্যাংকের সাথে ব্যাংকিং রিলেশন মেইনটেইন করতেন। তার ৩ টা ছেলেকে ওই ব্যাংকে এমটিও হিসেবে নেওয়ার জন্য রিকুয়েস্ট করেছিলেন। ব্যাংক এমটিও হিসেবে না নিয়ে জুনিয়র অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে বলেছিলো। কারণ এমটিও লেভেলের এমপ্লয়িরা আসলে ব্যাংকের মূল ডিসিশন মেকিং কাজগুলোতে ইনভলভড থাকে বলে এ জায়গার রিক্রুটমেন্ট এ ব্যাংকগুলো খুবই ফেয়ার পলিসি অ্যাপ্লাই করে। রেফারেন্সের রিক্রুটমেন্ট গুলো তারা সাধারণত এমটিও লেভেলের নীচেই দেয়। যাহোক, সেই ব্যবসায়ী ভদ্রলোক তখন গোস্বা করে তার ১৮ টি কনসার্নের অ্যাকাউন্টই সরিয়ে নেয় ওই ব্যাংক থেকে। ফলাফল…পুরো ব্রাঞ্চটাই কলাপস করেছিলো। এখন বলেন…ওই ব্যাংক কি পরবর্তীতে আর সেইম ভুল করবে?

 

তবে এমটিও লেভেলে রেফারেন্সে জব দেওয়ার এ সংখ্যাটা খুবই সামান্য।

যাহোক…যারা অভিযোগ করেন সবসময় যে একটার পর একটা প্রাইভেট ব্যাংকে অ্যাপ্লাই করছেন কিন্তু এক্সাম দেওয়ার জন্য শর্টলিস্টেড হচ্ছেন না কিন্তু একই ইউনিভার্সিটিতে, একই ডিপার্টমেন্টে পড়া আপনার হলের রুমমেইট শর্টলিস্টেড হচ্ছেন….আপনাকে বলবো আপনার সিভিটা ভালো করে অ্যানালাইসিস করতে। ইউনিভার্সিটি, ডিপার্টমেন্ট আর সিজিপিএ ই এখানে একমাত্র বিষয় না যেটা দেখা হয়। আরও অনেক স্কিল আছে যেটাতে হয়তো আপনার দুর্বলতা আছে। অভিযোগ না করে নিজের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো নিয়ে কাজ করেন।

 

এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তারা রেসিস্ট ও; আপনি কতোটা হ্যান্ডসাম বা কতোটা সুন্দরী এটাও দেখবে। এক্ষেত্রে হয়তো আপনার আমার কিছুই করার নেই, সৃষ্টিকর্তা যা দিয়েছেন সেটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। তবুও…আপনার জেসচার/পোসচার (ওই ছোট একটা পাসপোর্ট সাইজের ফটো থেকে যা বোঝা যায়) আপনাকে অনেকটাই এগিয়ে রাখবে। তাদেরকে দোষ দিইনা আমি। আমাদের সমাজের দোষ। ক্লায়েন্টরা একটা ভালো চেহারার রিপ্রেজেনটেটিভ দেখলে বেশী ইমপ্রেসড হয় বলেই এ অবস্থা। তিক্ত বাস্তবতা।

 

এক্সাম সিস্টেমঃ

 

এক্সাম কয়েকটা ধাপে হয় সাধারণত। শুরুর দিকে সেই একই বিষয়…আপনি ম্যাথস আর ইংলিশে কতটা ভালো সেটার উপরে ইনিশিয়ালি সিলেক্টেড হওয়া নির্ভর করবে। এ পর্যায়টা ভালো ব্যাংকগুলো আইবিএ বা বিআইবিএম এর মতো রেপুটেড ইন্সটিটিউশনের মাধ্যমে সম্পাদন করে। এজন্য পরীক্ষার স্ট্যান্ডার্ডস অনেক উচ্চমানের থাকে। এরপর হয়তো আসবে প্রেজেন্টেশন স্কিল টেস্ট (রেগুলার ব্যায়াম করার চেষ্টা করবেন। ছেলেরা মেয়েরা সবাই। টানা একবছর ব্যায়াম করা একজন যখন ফরমাল ড্রেস পরবেন বাকী সবাইকে বাদ দিয়ে যে সবার নজর তার দিকেই থাকবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।)। আইটি স্কিল পরীক্ষা করা হতেও পারে নাও পারে (ব্যাংকের উপরে ডিপেন্ড করবে)। ভাইভাটা খুবই ইমপরট্যান্ট। এখানেই পরীক্ষা নেওয়া হবে আপনি কতোটা স্মার্ট তার উপরে। কতটুকু ইমপ্রেস করতে পারছেন ভাইভা বোর্ডের মানুষদের সেটা বড় বিষয়। নিজেকে ভাইভা বোর্ডের ওদের জায়গায় কল্পনা করুন, যে আপনি উনাদের জায়গায় থাকলে আপনার প্রতিষ্ঠানে রিক্রুট করার জন্য কেমন এমপ্লয়ি খুঁজতেন।

 

 একটা বিষয় কি খেয়াল করেছেন? প্রায় সব ফরেন ব্যাংকই কখনও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয় না। এরা ইন্টারনাল রিক্রুটমেন্ট করে। বড়জোড় সিলেক্টেড কিছু ক্যাম্পাসে অন ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট। এখানেই চলে আসে আরেকটা বিশাল স্কিলঃ নেটওয়ার্কিং। আপনার অ্যালামনাই পাওয়ার এখানে খুব কাজে লাগবে। এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বা সিটি এন এ…এরা রিক্রুট করে অন্যভাবে। সিনিয়র লেভেলের কর্মকর্তারা তাদের খুব কাছের জুনিয়রদের সাথে যোগাযোগ করে বলেন, “সিভি দিয়ে যাস।” হয়ে গেলো জব। বড়জোড় একটা ছোট্ট ইন্টারভিউ সেশন হতে পারে। সুতরাং সিনিয়রদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে ভুলবেন না। ইগো জিনিসটাকে এসব ক্ষেত্রে ১০০ হাত দূরে রাখাই ভালো। আর এদের “ইন্টারন্যাশনাল গ্রাজুয়েট প্রোগ্রাম/গ্রাজুয়েট ট্রেইনি” নামে যে জবগুলো অফার করে ফরেন ব্যাংকগুলো সেটা অন্য লেভেলের জিনিস। এখানে সিলেক্টেড হইতে হইলে কি ধরণের স্কিলড হতে হয় সেটা আমি আইবিএ’র কিছু বিবিএ গ্রাজুয়েটদের দেখে বুঝেছি। রিক্রুটমেন্ট প্রোসেস খুবই ভয়ংকর লেভেলের রিগোরাস।

 

প্রাপ্তিঃ

 

প্রাইভেট ব্যাংকগুলোর কমপেনসেশন প্যাকেজ অবশ্যই হাই। এখানে কাজ করার সুযোগ আছে, সে অনুপাতে রিওয়ার্ড পাওয়ারও সুযোগ আছে। দিনশেষে এখানে স্কিলটাই দেখা হবে। যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরে যদি কোন একটা বিষয়ে আপনি হন চরম লেভেলের স্কিলড, তাহলে আর সারাজীবন পিছনে তাকাতে হবেনা। বছর ৭-৮ পরে এ ব্যাংক-ও ব্যাংক আপনাকে নিয়ে লিটারেলি টানাটানি শুরু করবে। ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স করাটা টাফ কারণ কর্পোরেট জবে সবসময়েই প্রেশার বেশী। আমার ফ্রেন্ডরা যারা অলরেডি ৮-১০ বছর ভালো ভালো প্রাইভেট ব্যাংকে জব করছে তারা খুব স্বাচ্ছন্দে লাইফ লিড করার পরেও মোটামুটি ৪০-৫০ লাখ টাকার সেভিংস করে ফেলেছে। উন্নত দেশগুলোতে স্কিলড মাইগ্রেশন করার ক্ষেত্রেও কিন্তু প্রাইভেট ব্যাংকের কর্মকর্তারা বেশ প্রাধান্য পেয়ে থাকেন। একটা বড় বিষয় হচ্ছে কর্পোরেট লাইফস্টাইল। এই লাইফস্টাইলটা অনেকেই পছন্দ করেন। ইনফ্যাক্ট আমি নিজেও খুব পছন্দ করি সরকারী জব করলেও। ঝাঁ চকচকে অফিস আর গ্ল্যামার শুধু কর্পোরেট জবেই পাবেন। বেশীরভাগ সময় শহরে অফিসে হওয়ার কারণে আপনার সন্তানও ভালো স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ পাবে। যেখানে সরকারী ব্যাংক হলে দেশের প্রত্যন্ত একটা জায়গায় ভাঙ্গা টেবিলের পিছনে বসে অফিস করার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশী।

 

(পরের পর্বে সরকারী ব্যাংকে রিক্রুটমেন্ট সিস্টেম এবং প্রাপ্তি নিয়ে লিখবো। কানেক্টেড থাকবেন। দুইটা পড়ে ডিসিশন নেবেন যে ব্যাংকিং ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছা থাকলে কোনদিকে যাবেন)

 

ফেরদৌস কবির
ডেপুটি ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ব্যাংক
এমবিএ, আইবিএ(ঢাবি)