ক্যারিয়ার কোন সেক্টরে গড়তে চান এটা নিয়ে অনেকেরই ডিসিশন নিতে বেশ সমস্যা হয়। অনেকে হুটহাট করে ডিসিশন নিয়েও ফ্যালেন। ২-৪ বছর পরে গিয়ে আফসোস হয় এটা না করে ওইটা করলেই ভালো হতো।

আমার নিজের ক্ষেত্রেই এরকম ঘটনা ঘটেছে। আইবিএ তে এমবিএ করাটা আমার একটা প্যাশন ছিলো। তখনও ডিসিশন নিতে পারিনি কোন সেক্টরে জব করবো। এমবিএ’র ক্লাস শুরু করার পরেও জব করা নিয়ে কোন চিন্তা কাজ করতোনা। জবে ঢুকতে চেয়েছিলাম এমবিএ শেষ করার পরে। সরকারী জবের ব্যাপারে তো বিন্দুমাত্রও আকর্ষণ ছিলো না তখন। আইবিএ হোস্টেলে থাকা অবস্থায় আশেপাশের কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ দের টাইট শিডিউল এবং রোবোটিক লাইফস্টাইল দেখেই প্রথম সরকারী জবে ঢোকার চিন্তা মাথায় আসে। আমার যেরকম লাইফস্টাইল তাতে আমি কর্পোরেট কালচারে খুব একটা মানিয়ে নিতে গেলে সেটা আমার মনের বিরুদ্ধে চলে যাবে বলেই একটা বিশ্বাস কাজ করছিলো। আমি খেলাধুলা করতে পছন্দ করতাম, ফিটনেস ফ্রিক ছিলাম অনেক আগে থেকেই, সেসময়ে ফটোগ্রাফির একটা ভূত চেপেছিলো মাথায়, সাথে আড্ডা দিতেও পছন্দ করি সবসময়। সব মিলিয়েই বুঝে গিয়েছিলাম যে আমার জন্য কর্পোরেট জব না। সরকারী জবের প্রতি সেসময় একটা বিতৃষ্ণা কাজ করতো। সরকারী অফিস মানেই দূর্নীতির আখড়া এরকম ধারণা ছিলো। কেন জানিনা বিসিএস এর প্রতি আগ্রহ জন্মায়নি কখনও; হয়তো এ সম্পর্কে সেসময় খুব বেশী তথ্য না জানা একটা কারণ ছিলো। এর মধ্যে হঠাৎ করেই বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি (জেনারেল ক্যাডার) এর সার্কুলার দিলো। সময়টা ২০১১ সালের শেষের দিক। সবাই বললো জবটা খুব ভালো, দূর্নীতি না করেও ভালোভাবে লাইফ কাটানোর সুযোগ আছে। তবে মাথার মধ্যে বেশী হিট করেছিলো ৮০ লক্ষ টাকার গৃহনির্মাণ আগামের (এটা যদিও পজিটিভ হয়নি আমার জীবনে। ফান্ড ঠিমতো ইউটিলাইজ করতে না পারলে নষ্ট হয়ে যায়। এটা কারও জীবন ঘুরিয়ে দেয়, কারও জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়) ব্যাপারটা। আইবিএ হোস্টেলের অনেকেই দেখলাম অ্যাপ্লাই করছে। আমার রুমমেইট আমাকে জিজ্ঞেস করলো করবো কিনা অ্যাপ্লাই। আমি সম্মতি দিতে সে ই অ্যাপ্লাই করে দিলো তার পিসি থেকে। যথারীতি পরীক্ষা দিয়ে যোগ দিলাম। এই জব নিয়ে বেশ কিছু আক্ষেপ থাকতে পারে হয়তো আমার মধ্যে; তবে আমি হাইলি স্যাটিসফাইড।

যাহোক, আসল কথায় চলে আসি। অনেকেই হয়তো জানেন আইবিএ তে এমবিএ শুরু করার আগে আমি ৬ মাস বিআইবিএম এ এমবিএম পড়েছি। এমবিএম বলেন আর এমবিএ, দুই জায়গাতেই দেখেছি আমি ক্লাসের সবচেয়ে বুইড়াদের মধ্যে। এভারেজে ক্লাসের সবাই আমার থেকে ৪-৫ বছরের জুনিয়র। সেটা নিয়ে কখনোই আক্ষেপ হয়নি তখন। কারণ আমি এটা খুব ভালোমতোই জানতাম যে এগুলো প্রোফেশনাল ডিগ্রি। যেকোন বয়সেরই একজন এসে পড়তে পারে এখানে। আক্ষেপটা শুরু হলো বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পরে। এখানেও এসে দেখলাম ব্যাচের প্রায় সবাই আমার থেকে ৪-৫ বছরের জুনিয়র। জুনিয়র মোস্ট ছেলেটা (পরে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে টিচার হিসেবে যোগ দিয়েছিলো) ছিলো প্রায় ৮ বছরের জুনিয়র৷ আক্ষেপটা হয়তো হতোনা যদি এই জবটা আমি বার বার পরীক্ষা দিয়ে পেতাম। এটাই ছিলো জবের জন্য দেওয়া আমার জীবনের প্রথম পরীক্ষা। বাংলাদেশ ব্যাংকে বেশী বয়সে ঢোকার কারণে আমার প্রোমোশন টা সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত হওয়ার চান্স নেই বললেই চলে৷ এ আক্ষেপ ছাড়াও এটার আরও অনেক ইমপ্যাক্ট আছে এগুলো আপনারা যখন জব লাইফে যাবেন তখন বুঝতে পারবেন৷

আমার এখন আক্ষেপ হয় কেন আমি চাকুরীর জন্য আগেই পরীক্ষা দেওয়া শুরু না করে আইবিএতে এমবিএ করার মতো জাস্ট একটা প্যাশনের দিকে ছুটলাম। জানিনা আগে পরীক্ষা দিলে জব হতো কিনা, তবে এই আক্ষেপটা যে থাকতো না এটা নিশ্চিত; যেকোন প্রাপ্তির ক্ষেত্রেই ভাগ্য একটা বড় বিষয়। তখন ডিসিশনগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে হেল্প করার মতো কাউকে পাইনি। আবার তখন বয়সটাই ছিলো এমন যে নিজেই ছিলাম সবজান্তা শমসের। কারও পরামর্শ নিতে ভালো লাগতোনা। তবে এটাও একটা কারণ হতে পারে যে আইডল মানার মতো কাউকে পাইনি, যার প্রতিটি কথা আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনবো এবং মেনে চলবো।

আজ একটা ছেলে ইনবক্স করে জানালো ক্যারিয়ার বিষয়ে তার ডিসিশন নিতে কষ্ট হচ্ছে, আমি যেন হেল্প করি একটু। সে বেশ কনফিউজড যে বিসিএস দেবে, কর্পোরেট জব করবে, নাকি সরকারী ব্যাংকে ঢুকবে। মানুষের জীবনে বড় ডিসিশন গুলো যে নিজেকেই নিতে হয় সেটাই জানালাম তাকে। তাকে পরামর্শ দিলাম…এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে দূরে কোথাও চলে যান, যেখানে নীরবতা আছে প্রচুর, সাথে অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। একা একা। সেখানে গিয়ে দু’দিন আগে মন ফ্রেশ করেন, চারপাশটা উপভোগ করেন। দু’দিন পরে খাতা কলম নিয়ে বসেন। ক্যারিয়ারের প্রতিটি সম্ভাব্য অপশন লিখবেন। প্রতিটি অপশনের সুবিধা, অসুবিধা, সম্ভাবনা এবং এই কাজের প্রতি আপনার মনের টান….সব লিখে ফ্যালেন। কোন সেক্টরের বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না পেলে ফেসবুকের জব গ্রুপগুলো/সেখানে জব করে এরকম কারো কাছ থেকে হেল্প নেন। তথ্য কমপ্লিট করার পরে অ্যানালাইসিস করেন একদিন/দুইদিন সময় নিয়ে।

একদিন মাঝরাতে বেশ নীরব একটা জায়গা বেছে নিয়ে নিজের মন কি চায় সেটা প্রশ্ন করেন নিজেকে। নিজের সামর্থ্য, দুর্বলতা, সম্ভাবনা, পারিবারিক অবস্থা সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন করেন নিজেকে। বিন্দুমাত্র আবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে বাস্তবতার নিরিখে ভাবেন সবকিছু। তারপর অাগেরদিনের করা অ্যানালাইসিস সামনে নিয়ে ভেরিফাই করেন। খুব ঠান্ডা মাথায় চূড়ান্ত একটা ডিসিশন নেন। তবে মাথায় রাখবেন, দিনশেষে কিন্তু প্যাশনের থেকে পেটে ভাত বেশী দরকার হবে আপনার।

এই যে চূড়ান্ত ডিসিশনটা নেবেন সেটা যেন কখনও চেঞ্জ না হয় আর। চূড়ান্ত মানে চূড়ান্ত। এখানেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে বিসিএস দেবেন, নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকে জব করবেন, নাকি সরকারী ব্যাংকে জব করবেন, কর্পোরেট জবে ঢুকবেন, নাকি আপনার পেটে ভাত নিয়ে কোন সমস্যা না থাকার কারণে দেশে বা বিদেশে উচ্চশিক্ষার দিকে দৌড়াবেন। এ সিদ্ধান্ত নিতে পারলে সেটি অর্জন করতে কি কি করতে হবে সেটা দেখবেন অটোম্যাটিক্যালি হয়ে যাচ্ছে।

ফেরদৌস কবির
ডেপুটি ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ব্যাংক
এমবিএ, আইবিএ(ঢাবি)