আপনাদের অনেকেই তো কাঁচাবাজারে যান রেগুলার। অনেকেই আবার মাঝে মাঝে মায়ের ঝাড়ি খেয়ে সকালে ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখ ডলতে ডলতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে হাঁটা দিতে বাধ্য হন

 

ধরুন এরকমই কোন একটা সকালে ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে মাছের বাজারে গেলেন। দরদাম করে একটা মাছ দেখে শুনে পছন্দ করে তুলে দিলেন পাল্লায়। পাল্লায় ওজন দেখলেন ৮৭৫ গ্রাম। মাছওয়ালা মামা কোন চিন্তাভাবনার অবকাশ না দিয়েই ধুম করে বলে দিলো, “মামা, এতো টাকা হইছে।” সেকেন্ডের কাঁটা নড়ার আগেই হিসাব শেষ! আপনি কিছুক্ষণ মাছওয়ালা মামার দিকে তাকিয়ে থেকে খাবি খেলেন (মাছ যেরকম খাবি খায়)। তারপর মাথার মধ্যে হিসাব করতে শুরু করলেন। ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখ নিয়ে বাজারে গিয়েছিলেন। ৩০ সেকেন্ড হিসাব মেলানোর চেষ্টা করতে গিয়ে দেখলেন ঘুম ছুটে গেছে চোখ থেকে। কোন কুলকিনারা না করতে পেরে ঘাড়ের কাছে ঘাম দেওয়া শুরু হইছে!

 

মাথার মধ্যে একটাই চিন্তা, “মাছওয়ালা মামা কি ঠিক দাম বলেছে? নাকি বেশী নিচ্ছে আমার কাছ থেকে! বেশী নিলে কতো বেশী নিচ্ছে!” মিনিটখানেক চেষ্টা করে কূলকিনারা করতে পারলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন। দেখলেন হিসাব ঠিকই আছে, মাছওয়ালা মামা বেশী নিচ্ছেনা। চিন্তা করবেন, “শালা এতো দ্রুত হিসাব করলো ক্যামনে!”

 

আর যদি হিসাব মিলাতে না পারেন, তাহলে আর কি করা! মামা হিসাব করে যেটা বলেছে বিরস বদনে দিয়ে আসবেন সেটাই। মনে মনে নিজেকে গালি দিয়ে বলবেন, “কোন কুক্ষণেই যে মোবাইলটা (পড়ুন ক্যালকুলেটর) বাসায় রেখে বের হয়েছিলাম!”

 

কি? পরিচিত মনে হচ্ছে ঘটনাটা? মিলে যাচ্ছে না অনেকের জীবনের সাথেই?

 

কখনও কি চিন্তা করে দেখেছেন, মাছওয়ালা মামা কিভাবে এতো দ্রুত হিসাব করতে পারে? চোখের পলকে? সে তো আর আপনার মতো ইউনিভার্সিটিতে পড়েনি!

 

প্র‍্যাকটিস! প্র‍্যাকটিস!! প্র‍্যাকটিস!!!

 

দ্রুত হিসাব করা শিখতে হলে আপনাকে প্রচ্চুর প্র‍্যাকটিস করতে হবে। শুধু গ্রুপে গিয়ে গিয়ে পোস্ট দেবেন, “কেউ কি বলতে পারেন, কোন বই পড়লে দ্রুত ক্যালকুলেট করতে পারবো?”… হবেনা তাতে!

ক্যালকুলেটর বাদে বড় বড় হিসাব করতে পারাটাও অনেক আনন্দের। যাহোক, আনন্দ জিনিসটা দূরেই রাখলাম। আপনাদের মধ্যে খুব কম মানুষই আনন্দ পেতে এরকম কিছু করবেন…সেটা আমি জানি। এর চেয়ে বড় বড় আনন্দ আছে না! আড্ডা মারা, টাংকি মারা, চ্যাটিং, সেক্সটিং…কত কি!

যাহোক, ক্যালকুলেশনের মধ্যে আনন্দ পাওয়ার লাভের কথা বলতে আসিনি আমি। অন্য লাভ আছে এখানে। পিওর লাভ!

 

এটা এমনই একটা ম্যাজিক যেটা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দু’জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে বড় ব্যাবধান তৈরী করে দেয়। চিন্তা করে দেখুন তো, ক্যালকুলেশনে ভালো হওয়ার কারণে যদি ধরি প্রতিটি অংক করতে অন্য আরেকজনের চেয়ে আপনার এভারেজে ২০ সেকেন্ড করে কম লাগছে…তাহলে কেমন হবে? যদি ধরি এভারেজ একজনের একটা অংক করতে দেড় মিনিট করে সময় লাগে, তাহলে এভারেজ একজন ৩০ মিনিটে ২০ টি অংক করবে আপনি সে সময়ে করবেন ২৫ টি অংক! মাত্র ৩০ মিনিটেই এগিয়ে গেলেন ৫ মার্ক! জানেন, জবের পরীক্ষাগুলোতে ৫ মার্ক বেশী পাওয়া মানে কয় হাজার জনকে টপকে যাওয়া? ৫ মার্ক বেশী পেলে আইবিএ’র এমবিএ ভর্তি পরীক্ষায় কয়শত প্রতিযোগীকে ডিঙ্গানো যায় জানেন? প্রতি অংকে ২০ সেকেন্ড করে কম লাগলে জিম্যাট, জিআরই বা স্যাট এক্সামে কয়টা অংক বেশী করতে পারবেন জানেন?

 

হয়তো জানেন, কিন্তু দু-একজন ছাড়া আপনাদের কেউ কখনও রিয়েলাইজ করেননি ব্যাপারটা এভাবে!

 

মাথার মধ্যে এভাবে ক্যালকুলেশন করাকে গ্লোবালি বলা হয় “মেন্টাল ম্যাথস।” বড়ই মজার একটা জিনিস। প্র‍্যাকটিস করতে শুরু করুন এখন থেকেই। প্রথমে কষ্ট হলেও একটা সময় পরে দেখবেন প্রেমে পড়ে গেছেন রীতিমতো। তখন দেখা যাবে বয়ফ্রেন্ড/গার্লফ্রেন্ডকে সময় না দিয়ে ম্যাথসকে সময় দিতে বেশী ভালো লাগছে…হা হা হা!

 

আর…মাছ কিনতে গিয়ে চোখের পলকে হিসাব করে উল্টা মাছওয়ালা মামাকেও চমকে দিতে পারবেন। বলতে পারবেন, “৩৭২ টাকা হইছে, ৩৭৫ টাকা বললেন ক্যান?”

 

ফেরদৌস কবির

ডেপুটি ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ব্যাংক

এমবিএ, আইবিএ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

এমবিএ (আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)