খুবই কমন এবং বহু জিজ্ঞাসিত একটি প্রশ্ন হলেও উত্তর দেওয়াটা বেশ কঠিন।

কারণ, এ উত্তরের উপরেই অনেক ছাত্র-ছাত্রীর লাইফের বেশ বড় বড় অর্জন নির্ভর করবে। আবার, ভুল উত্তর হয়ে গেলে একজনের লাইফ নষ্ট হতেও সময় লাগবেনা। এজন্যই আমি পরামর্শ দেওয়ার সময় বলে দিই সবসময়…”আমি জাস্ট পরামর্শ দিচ্ছি। আমার এতোদিনের এক্সপেরিয়েন্স (নিজের ধাক্কা খাওয়ার) থেকে জাস্ট একটা “ওয়ে আউট” দেখিয়ে দিচ্ছি আপনাদের। ফাইনাল ডিসিশন কিন্তু আপনাকেই নিতে হবে, কারণ জীবনটা আপনার।”

এনিওয়ে, আসল কথায় চলে আসি। আমি মনে করি, ছোট্ট একটি পিছুটানের কারণেই আসলে আপনারা এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আপনাদের বেশীরভাগই ইউনিভার্সিটি লাইফে সিজিপিএ’র পিছনে দৌড়ান। ধরুন, আপনার সিজিপিএ আছে ৩.৫০; আপনি এটাকে কিভাবে ৩.৭০ এর উপরে নেওয়া যায় তার জন্য ফাইট করে যাচ্ছেন। একবারও কি চিন্তা করেছেন…এই ০.২০ সিজিপিএ বাড়িয়ে আপনার কি লাভ হবে? সিজিপিএ একটা ভাবের জিনিস। মানুষের কাছে গালগল্প করা যায়, খুব সহজে জুনিয়র মেয়েদের পটানো যায়। এসব কারণই তো… তাই না? এর বাইরে আর কোন লাভ আছে? চাকুরী বা আইবিএ’র পরীক্ষায় কি আপনি অন্যদের থেকে ১০ মার্কস বেশী পাবেন? ভাইভাতে কি আপনাকে ২/৪ মার্কস বেশী দেওয়া হবে? স্ট্রেইট উত্তর..না। কোন এক্সট্রা সুবিধাই পাবেন না এসব ক্ষেত্রে। পরীক্ষার পারফরম্যান্স ই এখানে সবকিছু।

এখন আসেন…একবার কি ভেবে দেখেছেন এই এক্সট্রা সিজিপিএ’র জন্য কি পরিমাণ এক্সট্রা কষ্ট করতে হচ্ছে আপনাকে? এই যে এক্সট্রা ০.২০…এটা কিন্তু কিউমুলেটিভ। তারমানে সিজিপিএ ০.২০ বেড়ে যাওয়া মানে সেটা প্রতি বছরের রেজাল্টেই রিফ্লেক্টেড হওয়া। আপনার কোন একটা সেমিস্টারে ৩.৫০ পেতে যে কষ্ট করতে হবে, ৩.৭০ পেতে কিন্তু তার থেকে ডাবল কষ্ট করতে হবে। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই, হাত সামনের দিকে সোজা ধরে রেখে হাতের তালুতে এক গ্লাস পানি আপনি হয়তো ৫ মিনিট ধরে রাখতে পারবেন। এর পরে এক্সট্রা দশ সেকেন্ড ধরে রাখতেও আপনার হাতে পেইন শুরু হবে, তা হয়তো আগের পাঁচ মিনিট ধরে রাখার পেইন থেকে অনেক বেশী। কারণ প্রতিটি জীব এবং জড় পদার্থেরই ক্ষমতার একটা লিমিট থাকে। মানুষের ও ক্ষমতার লিমিট আছে, মেশিনেরও আছে। সিজিপিএ’র ক্ষেত্রেও এই এক্সট্রা ০.২০ পেতে যে কষ্ট করতে হবে তা ৩.৫০ পাওয়া পর্যন্ত যে কষ্ট করতে হবে তার চেয়ে কম হবেনা। এই ০.২০ এক্সট্রা পেতে আপনাকে আপনার লিমিটের শেষ সীমার কাছাকাছি চলে যেতে হচ্ছে। তাহলে কেন এই আজাইরা কষ্ট করছেন শুধু শুধু? অলমোস্ট কোন বেনিফিট ছাড়া?

কি করতে পারেন তাহলে সিজিপিএ পিছনে না দৌড়ে?

এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ খুবই সিম্পল। এক্সট্রা এই সিজিপিএ’র পিছনে না দৌড়ে ওই কষ্টটা কোন প্রোডাক্টিভ খাতে করেন। সেকেন্ড ইয়ার শেষে যদি দ্যাখেন আপনার একটা ডিসেন্ট সিজিপিএ হয়ে গেছে (সরকারী জব বা আইবিএ টাইপ টার্গেট থাকলে ৩.২০-৩.৩০; প্রাইভেট ব্যাংক টার্গেট থাকলে ম্যাক্সিমাম ৩.৫০ পর্যন্ত থাকলেই এনাফ) তাহলে থার্ড ইয়ারের শুরু থেকেই প্রোডাক্টিভ খাতে কষ্ট করা শুরু করেন।

কি কি করতে পারেন এই সময়ে সেটা আরও স্পেসিফিক করে দিচ্ছিঃ

১। পড়াশোনার শেষ করে যদি মূল টার্গেটই হয় একটা ভালো সরকারী চাকুরী (বিসিএস, ব্যাংক বা ৯ম গ্রেডের অন্য জব) বা একটা ভালো এমবিএ প্রোগ্রামে (আইবিএ টাইপ) ভর্তি…তাহলে এখন থেকেই প্রিপারেশন শুরু করে দেন। পাস করতে করতে আপনি ১০০% প্রিপেয়ার্ড থাকবেন। ক্লাসমেইটরা যখন দৌড়াদৌড়ি করবে প্রিপারেশন নিয়ে, আপনি তখন মুচকি হাসবেন। ক্লাসমেইটরা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখবে আপনার জয়জয়কার। পাস করার পরে প্রিপারেশন নেওয়ার ৬মাস-১ বছর সময় নষ্ট হবেনা আর।

২। টার্গেট যদি হয় কর্পোরেট জবে গিয়ে ফাটিয়ে দেওয়া…রিলেটেড বিষয়গুলোতে স্কিল বাড়াতে থাকেন নিজের। মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ারপয়েন্ট এগুলোতে এক্সপার্ট হতে সময় ব্যয় করেন। প্রেজেন্টেশন স্কিল নিয়ে কাজ করেন, যেটা ইউনিভার্সিটিতে থাকতেই কাজে লাগবে। যে ক্লাসমেইটরা ১ম বর্ষে থাকতে আপনার প্রেজেন্টেশন দেখে খ্যাত, গ্রাম থেকে উঠে আসছে বলে হাসাহাসি করেছিলো…অনার্স শেষ বর্ষে গিয়ে আপনার প্রেজেন্টেশন দেখে যেন তারা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে।

৩। যদি প্ল্যান থাকে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়া…তাহলে এ সময়েই শুরু করে দিতে পারেন জিম্যাট বা জিআরই, টোফেল বা IELTS এর প্রিপারেশন। পাস করার পরে আর বেশী সময় নষ্ট হবেনা তাহলে।

৪। যদি লক্ষ্য থাকে উদ্যোক্তা হওয়ার…তাহলে থার্ড ইয়ার থেকেই আপনার লক্ষ্যের কার্যক্রমের সাথে মেলে এরকম কোন প্রতিষ্ঠানে পার্ট-টাইম জব শুরু করতে পারেন। বিশ্বাস করেন…প্রায় সব ব্যর্থ উদ্যোগের পিছনেই প্রধানতম দায়ী কারণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদ্যোক্তার বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা না থাকা।

৫। ইন্টারন্যাশনাল কোন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনে কাজ করার ইচ্ছা থাকলে থার্ড একটা ল্যাঙ্গুয়েজ শিখে ফেলতে পারেন। এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ ফ্রেঞ্চ শেখার জন্য।

এগুলো করলে লুজার যে হবেননা এটা নিশ্চিত। মাথায় রাখবেন, এমপ্লয়াররা কিন্তু ডাইভার্সিফায়েড স্কিল ই পছন্দ করেন সবচেয়ে বেশী।

বিঃদ্রঃ আপনি যদি ইউনিভার্সিটির টিচার হওয়া কিংবা ইউএসএ’র ফুল ব্রাইট বা কমনওয়েলথ টাইপের স্কলারশিপের লক্ষ্য নিয়ে আগান তাহলে এ পোস্ট আপনার জন্য প্রযোজ্য না। ওইসব ক্ষেত্রে…সিজিপিএ ম্যাটারস! তবে মাথায় রাখবেন, টিচার হওয়ার জন্য দৌড়ানো কিন্তু কাইন্ড অফ মেডিকেল ভর্তি কোচিং এর মতো; আসলটা ফস্কে গেলে অন্যগুলো আরও ডিফিকাল্ট হয়ে যাবে!

ফেরদৌস কবির

ডেপুটি ডিরেক্টর,

বাংলাদেশ ব্যাংক